মেলান্দহে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, শিক্ষক বদলি

শাহিন আলম হৃদয়, স্টাফ রিপোর্টার:

​জামালপুর মেলান্দহ উপজেলায় চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত শিক্ষক মাহবুবুর রহমান উপজেলার ১৩ নং পশ্চিম মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত।
​ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিচার বা সালিশি বৈঠক করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে মেলান্দহ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে এবং মামলা রুজুর জন্য বাদী পক্ষকে থানায় আসতে বলা হয়েছে।
​টিফিনের বিরতিতে ঘটনা
​ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর (রবিবার) টিফিনের বিরতির সময় বিদ্যালয়ে একটি ইসলামি সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছিল। অন্য শিক্ষার্থীরা যখন প্যান্ডেলের সাজসজ্জা দেখছিল এবং খেলাধুলা করছিল, সেই সুযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক মাহবুবুর রহমান তাকে ডেকে একটি শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যান। পরে দরজা বন্ধ করে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ শিশুটির।
​শিক্ষার্থী আরও জানায়, সে সময় চিৎকার করার চেষ্টা করলে শিক্ষক তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। টিফিনের বিরতি শেষ হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
​ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ
​ঘটনার পরপরই শিশুটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ইসরাত জাহানকে বিষয়টি জানায়। তিনি অন্য শিক্ষিকা রহিমাকে অবহিত করলে তাঁরা শিক্ষার্থীর বাবা-মাকে বিদ্যালয়ে ডেকে পাঠান।
​পরিবারের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে দরজা বন্ধ করে ঘটনাটি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীর বাবা অভিযুক্ত শিক্ষকের কলার ধরলে ওই শিক্ষক তাঁর পা জড়িয়ে ধরেন বলে দাবি করেছে শিশুটি।
​বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জেসমিন খাতুন জানান, ঘটনার পরদিন তিনি ওই শিক্ষার্থীর বাড়িতে খোঁজ নিতে গেলে তার বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অভিযুক্ত শিক্ষককে যেন আর বিদ্যালয়ে দেখা না যায়।
​ভুক্তভোগীর বাবা জানান, সুবিচার না পেয়ে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে আপাতত মায়ের সঙ্গে নানার বাড়িতে রাখা হয়েছে।
​সরেজমিন অনুসন্ধান ও তদন্ত
​ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সাংবাদিক ফোরামের পক্ষ থেকে সরজমিনে অনুসন্ধান চালানো হয়। গত ১৩ আগস্ট দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ১৩ নং পশ্চিম মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে প্রধান শিক্ষিকা জেসমিন খাতুন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
​তবে সহকারী শিক্ষিকা ইসরাত জাহান প্রথমে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, “এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না, পরিবারের নির্দেশ আছে।” পরে তিনি যোগ করেন, “প্রধান শিক্ষিকা যা বলেছেন, সেটাই সত্য।”
​পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাড়িতে গেলে তার চাচি ও দাদি ঘটনার বিস্তারিত জানান। শিক্ষার্থীর নানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে শিশুটি ও তার মা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
​এদিকে গত ১৪ অক্টোবর বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মাহবুবুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। প্রধান শিক্ষিকা জেসমিন খাতুন জানান, তাঁকে অন্য একটি বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। পরবর্তীতে মুঠোফোনে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপজেলার গোবিন্দী এলাকায় তাঁর নিজ বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া হলে তাঁর বড় ভাবি জানান, তিনি বাড়িতে নেই।
​পুলিশের বক্তব্য
​এ বিষয়ে মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগটির প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
​ওসি আরও বলেন, “বাদী পক্ষকে একাধিকবার থানায় আসতে বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা পরবর্তীতে আর পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তাঁরা থানায় এলে মামলা রেকর্ড করে নেওয়া হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
​ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তার পরিবার এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *