তানভীর হাসান সৈকত, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ফুকরা ইউনিয়নের ১৬১ নম্বর কলসীফুকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও শিক্ষার মানোন্নয়নের চেষ্টা করায় সহকারী শিক্ষিকা মিতু রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছে শিক্ষা বিভাগ।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষিকা মিতু রহমান বলেন, তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ করাই তাঁর লক্ষ্য। তিনি কখনো দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেননি। বিদ্যালয়ে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করায় একটি পক্ষ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বানোয়াট অভিযোগ ছড়াচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া একটি অনলাইন পোর্টালে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর মানহানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই শিক্ষিকা। এ ঘটনার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের দাবি, শিক্ষিকা মিতু রহমান বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা করছেন। এ কারণে একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক অপপ্রচার চালাচ্ছে।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠীদের স্কুলব্যাগ থেকে টাকা ও কলম চুরি, অসদাচরণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কথাবার্তা বলার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে মিতু রহমানসহ অন্য শিক্ষকরা ওই শিক্ষার্থীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের বিদ্যালয়ে আসার খবর দিতে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পাঠানো হয়। এ সময় ওই শিক্ষার্থীর বাবা-মা খবর নিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার ও গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর সহপাঠীদের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর দূরত্ব তৈরি হয় এবং সে বিদ্যালয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়ে বলে জানান সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীর বাবা সাজু মোল্লা বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র (টিসি) নিয়ে তাঁকে ৯৯ নম্বর ফুকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক আরও অভিযোগ করেন, কয়েক বছর আগে একই বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীর আচরণ নিয়ে মিতু রহমানের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই শিক্ষার্থীর চাচা বদরুল আলমের সঙ্গে তখন শিক্ষিকার বিরোধ তৈরি হয় বলে তাঁদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, পুরোনো সেই বিরোধের জের ধরে বর্তমান ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পেছনে একটি পক্ষ ভূমিকা রাখছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেলিনা খাতুন বলেন, নুসরাত ফারিয়ার বাবা তাঁর মেয়ের অসুস্থতা ও বিভিন্ন অসুবিধার কথা জানিয়ে ছাড়পত্র নিতে এসেছিলেন। তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকায় তা দিতে হয়। ছাড়পত্র নেওয়ার সময় তিনি কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। পরে একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানতে পারেন, তাঁর মেয়ে নাকি শিক্ষিকার নির্যাতনের কারণে বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
সেলিনা খাতুন আরও বলেন, তাঁর জানা মতে, বিদ্যালয়ে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করেন না।
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সেলিম হোসেন বলেন, তাঁর মেয়েও এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিদ্যালয়ে কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েনি। শিক্ষিকা মিতু রহমান নিয়ম-শৃঙ্খলার বিষয়ে কিছুটা কঠোর হলেও শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন করেন না বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
এ বিষয়ে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) পলাশ সর্দার বলেন, শিক্ষিকা মিতু রহমানের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত ছাড়া অভিযোগটি সত্য, নাকি অপপ্রচার—তা বলা সম্ভব নয়। অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত শুরু করা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকাকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে।
তবে শিক্ষিকার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, পাল্টা দাবি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন অভিভাবকেরা।