১১ নং শ্যামপুর ইউপি পুরোনো ভোটকেন্দ্র বহালের দাবি, প্রবীণদের বয়কটের হুঁশিয়ারি।

​জামালপুরের ১১ নং শ্যামপুর ইউনিয়নের ১ নং ও ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের নির্ধারিত ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। কেন্দ্র পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াকে ‘অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে প্রস্তাবটি বাতিলের দাবিতে জেলা লনির্বাচন কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন এলাকাবাসী। পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি তদন্ত ও খতিয়ে দেখতে সরেজমিনে পরিদর্শনে যান জামালপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক।

​আড়াই দশকের ঐতিহ্য ও ভোটাধিকার

লিখিত আবেদন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ বছর ধরে ১ নং ওয়ার্ডের ‘চরগোয়ালিনী ইউনিয়ন ভূমি অফিস’ প্রাঙ্গণে ‘মরহুম আসাদুজ্জামান চৌধুরী নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা’ স্থানীয় ভোটাররা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন। তবে সম্প্রতি কোনো বাস্তব কারণ ছাড়াই ঐতিহ্যবাহী এই কেন্দ্রটি পরিবর্তন করে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরের ‘আমডাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ স্থানান্তরের একটি প্রস্তাব করা হয়।

​ভোটার পরিসংখ্যান ও জনসংখ্যার চিত্র

​গোবিন্দী গ্রাম: ভোটার সংখ্যা ৬৩৫ জন

​আমডাঙা গ্রাম: ভোটার সংখ্যা ৫৬৯ জন

​মোট ভোটার: ১,২০৪ জন (পুরুষ–৬১৬, নারী–৫৮৮)

​প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শঙ্কা ও প্রবীণ ভোটারের আকুতি

গোবিন্দী গ্রামটি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের দিক থেকে অবহেলিত। এলাকায় ভোটকেন্দ্র বিদ্যমান থাকায় এতদিন স্থানীয় বাসিন্দারা অন্তত রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যায়নের সুযোগ পেতেন। কেন্দ্রটি সরিয়ে নেওয়া হলে প্রান্তিক এই জনপদ কেবল ভোটাধিকারের সুবিধাই হারাবে না, বরং সামাজিক সুরক্ষাসহ নানা সরকারি কল্যাণমূলক সুবিধা থেকেও আরও বঞ্চিত হবে বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর।

​ভৌগোলিক দূরত্ব ও আঁকাবাঁকা সরু কাঁচা রাস্তার কারণে প্রবীণ, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও নারী ভোটারদের জন্য যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের আকুতি প্রকাশ করে গোবিন্দী গ্রামের অশীতিপর প্রবীণ ভোটার মোহাম্মদ বকুল  (৮৫) বলেন:

​”বাপু রে, এই বয়সে ল্যাহা-পড়া না জানা আমাগো মতো বুড়ো মানুষের কাছে ভোট দেওয়াডা কেবল অধিকার না, জীবনের শেষ আনন্দ। গত পঁচিশ বছর ধইরা ঘরের কাছে ভূমি অফিসে গিয়া শান্তিতে ভোট দিয়া আসছি। এহোন হুনতাছি কেন্দ্র নাকি তিন কিলোমিটার দূরে গাঙে পারের আমডাঙায় নিয়া যাইবো! ওই হানের সরু আর ভাঙা রাস্তা দিয়া লাঠি ভর দিয়া হেঁটে যাওয়া আমার মতো জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অন্য পাড়ায় কেন্দ্র গেলে মারামারি-হাঙ্গামার ভয়ও থাকে, আমরা বয়স্করা তখন কনে যামু? আমাগো শেষ বয়সের এই অধিকারটুকু কাড়ি নিয়েন না। কেন্দ্র যদি আগের জাগাত না রাখা হয়, তবে আমাগো গোবিন্দী গ্রামের ৬৩৫ জন ভোটার একযোগে ভোট বয়কট করতে বাধ্য হমু।”

​অবকাঠামোগত সুবিধা ও তদারকি

এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমান কেন্দ্র ‘চরগোয়ালিনী ইউনিয়ন ভূমি অফিস’ এর সাথে সংলগ্ন ‘মরহুম আসাদুজ্জামান চৌধুরী নূরানী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা’ সিসি ক্যামেরাসহ পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, যা একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ ভোটগ্রহণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। ফলে নতুন জায়গায় কেন্দ্র স্থানান্তরের কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন নেই।

​অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক গোবিন্দী এলাকার বর্তমান কেন্দ্র ও সংযোগ সড়কগুলো দীর্ঘসময় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তিনি প্রবীণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ধৈর্যসহকারে শোনেন। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা—জনস্বার্থ, নিরাপত্তা ও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষায় পূর্বের স্থানকেই ভোটকেন্দ্র হিসেবে বহাল রাখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *