আর্থিক সহায়তা নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ’ চান উপকূলীয় বরগুনা বাসী।

ইত্তিজা মনির, বরগুনা প্রতিনিধি

জলোচ্ছ্বাস ঘূর্ণিঝড়ের সময় সামনে রেখে বারবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বরগুনার উপকূলের লাখো মানুষ। দীর্ঘদিনের ভাঙন, জোয়ারের চাপ ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন তারা। তবে এবার তাদের দাবি শুধু জরুরি মেরামত কিংবা দুর্যোগের পর আর্থিক সহায়তা নয়- প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নির্মিত টেকসই ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ।

জেলার তালতলী, পাথরঘাটা, আমতলী, বেতাগী ও সদর উপজেলার নদী-সাগরঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় বাঁধের কোথাও ভাঙন, কোথাও ধস, কোথাও একেবারে বিলীন হয়ে যাওয়া, আবার কোথাও নিচু ও সরু হয়ে যাওয়ার চিত্র রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর দুর্যোগের আগে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে মাটি বা জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক সংস্কার করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই জোয়ার ও নদীভাঙনে তা আবার দুর্বল হয়ে পড়ে।

উপকূলবাসীর ভাষ্য, এই চক্র আর তারা চান না। তাদের স্পষ্ট কথা- ‘দুর্যোগের পর আর্থিক সহায়তা নয়, দুর্যোগের আগেই টেকসই বেড়িবাঁধ চাই।’

বরগুনা সদর উপজেলার আজগরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা সেলিম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘প্রতিবার ঝড়ের আগে বাঁধ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। কোথাও মাটি সরে যায়, কোথাও ফাটল দেখা দেয়। তখন সাময়িকভাবে মাটি বা বস্তা ফেলা হয়। কিন্তু আমরা বারবার এই অস্থায়ী ব্যবস্থা চাই না। এমন বাঁধ চাই, যেটা বড় জোয়ার ও ঝড়ের চাপ সামলাতে পারবে।’

নলীর মাইঠার গৃহবধূ রেহানা বেগম বলেন, ‘ঝড় এলে আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় পানি। ঘরবাড়ি, সন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে তখন নিরাপদ জায়গা খুঁজতে হয়। পরে ত্রাণ দেওয়া হয়, খাবার দেওয়া হয়- কিন্তু আমরা ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে চাই না। এমন বাঁধ চাই, যাতে পানি আমাদের ঘরেই ঢুকতে না পারে।’

নলটোনা নিশানবাড়িয়া এলাকার কৃষক মোঃ ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘একবার লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকলে কৃষকের অনেক ক্ষতি হয়। ফসল নষ্ট হয়, জমির উর্বরতা কমে যায়। তাই ক্ষতি হওয়ার পর ক্ষতিপূরণ বা ত্রাণ দেওয়ার চেয়ে আগে বাঁধ শক্ত করা অনেক বেশি প্রয়োজন।’

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দারা জানান, শুধু বাঁধের উচ্চতা বাড়ালেই হবে না।

পাথরঘাটার নদীতীরবর্তী গোড়া পদ্মা এলাকার বাসিন্দা মো. মজনু হাওলাদার বলেন, ‘বড় জোয়ার এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। কোথাও বাঁধ আছে, কিন্তু সেটি যথেষ্ট উঁচু নয়; কোথাও আবার বাঁধ নদীর খুব কাছে চলে এসেছে। সরকার যদি একবার পরিকল্পনা করে স্থায়ীভাবে বাঁধ তৈরি করে, তাহলে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা জরুরি মেরামতে খরচ করার প্রয়োজন হবে না।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আবদুল কাদের মোল্লা বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উপকূল রক্ষার জন্য টেকসই বাঁধের বিকল্প নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা দরকার।’

ওয়াপদ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, জেলার বিভিন্ন বাঁধ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্থায়ী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তবে বড় ধরনের টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া বরগুনাবাসীর জন্য।

উপকূলবাসীর অভিযোগ, একটি বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের পর সেটির স্থায়িত্ব কত বছর হবে, কী ধরনের জলোচ্ছ্বাস সহ্য করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে নদীভাঙনের গতিপথ কী হতে পারে-এসব বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। ফলে কিছুদিন পর আবার একই বাঁধ নিয়ে নতুন করে প্রকল্প ও সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়।

উপকূলবাসীর দাবি, ত্রাণনির্ভর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় যেতে হবে। প্রতি বছর দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি কেন বারবার একই এলাকায় বাঁধ ভাঙছে, তার স্থায়ী কারণ চিহ্নিত করতে হবে।

উপকূলবাসীর প্রত্যাসা জেলার ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করা হবে। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মান।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের এখন একটাই দাবি- ঝড় এলে ত্রাণ নয়, ঝড় আসার আগেই নিরাপত্তা চাই। আর্থিক সহায়তা চাই না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *