সাইছুল্লাহ, খুলনা প্রতিনিধি

শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের নামে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানকে ঘিরে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে ক্ষুদে প্রতিভার রাজ্যে (কেপিআর)-এর বিরুদ্ধে। রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করে নিম্নমানের পুরস্কার প্রদান এবং অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছেন অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও কয়েকজন শিক্ষক। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ঢাকা, খুলনা, নড়াইল, বরিশাল, ফেনী, জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলাতে এ ধরনের আয়োজন করেছে।গত ১২ জুন খুলনা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে কেপিআর খুলনা জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জেলার ৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা।গভঃ ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের শিক্ষার্থী রাফিয়ার অভিভাবক মোমেনা খাতুন বলেন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হয়। সে হিসাবে শুধুমাত্র রেজিস্ট্রেশন খাত থেকেই সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকা। কিন্তু পুরস্কার হিসেবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয় নিম্নমানের কাঠের তৈরি একটি ক্রেস্ট, যার বাজারমূল্য ৫০ থেকে ৬০ টাকার বেশি নয়।অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থীর অভিভাবক সম্রাট কাজীসহ একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিভা বিকাশের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও সেই অর্থের প্রতিফলন অনুষ্ঠান বা পুরস্কারের মানে দেখা যায়নি। বরং তীব্র গরমের মধ্যে শিশুদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, পানীয় জল কিংবা ন্যূনতম আপ্যায়নের ব্যবস্থাও ছিল না বলে অভিযোগ তাদের।পাইওনিয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রাশেদা বেগম বলেন, “শিশুদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুরস্কারের মান দেখে আমরা হতাশ। আয়োজকরা চাইলে অন্তত শিশুদের জন্য নাস্তা বা স্মারকস্বরূপ মানসম্মত কিছু দিতে পারতেন। অনুষ্ঠান পরিচালনার সময় প্রতিষ্ঠানের নামও সঠিকভাবে উচ্চারণ করা হয়নি।”অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে এমন আয়োজন তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করতে পারে। তারা আয়োজকদের কাছে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।এদিকে অনুষ্ঠানে ৩ থেকে ৪ বছর বয়সী কয়েকজন শিশুকেও পুরস্কার গ্রহণ করতে দেখা যায়। এত অল্প বয়সী শিশুদের চিত্রাঙ্কনের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়ার মানদণ্ড কী ছিল, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক অভিভাবক।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক পরিচালক খন্দকার রেজাউল হাসেম। সভাপতিত্ব করেন কেপিআর পরিচালক এনামুল হক রিংকু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কেপিআর-এর সহকারী পরিচালক অ্যাডভোকেট মো. ইমরান খান। বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা কালচারাল অফিসার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি ১২ মার্চ ঢাকার সেগুনবাগিচায়, ২৪ এপ্রিল ফেনী শিল্পকলা একাডেমিতে, ২২ মে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি, ৫ জুন শেরপুর শিল্পকলা একাডেমি,৬ জুন জামালপুর শিল্পকলা একাডেমীতে, ১২ জুন খুলনা শিল্পকলা একাডেমি এবং ১৩ জুন নড়াইলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ধরনের আয়োজন করেছেন বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে। অর্থ বাণিজ্যসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে কেপিআর এর পরিচালক এ্যাড, মোঃ ইমরান খান সাংবাদিকদের বলেন, সাবার মন অর্জন করা সম্ভব নয়। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন আমার কোন মন্তব্য নাই। যারা প্রোগ্রামে এসে অসত্য কথা বলে তারা গাধার দল। প্রোগ্রামের শৃঙ্খলা এবং পরিবেশের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আকাশের মধ্যে একটি প্লেনে প্রোগ্রাম করলে এর থেকে সুন্দর হতো। আর তার থেকে বেশি সুন্দর করতে একটি জান্নাত তৈরি করে সেখানে প্রোগ্রাম করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে সঠিক কোন উত্তর না দিয়ে এ বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান।শিক্ষাবিদদের মতে, শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশের নামে আয়োজিত যেকোনো কর্মসূচিতে আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এমন উদ্যোগের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।প্রতিভা বিকাশের নামে পরিচালিত এসব কার্যক্রমে প্রকৃত উদ্দেশ্য কতটা শিক্ষামূলক আর কতটা বাণিজ্যিক—সেই প্রশ্ন এখন অংশগ্রহণকারী অভিভাবক ও শিক্ষকদের মুখে মুখে ঘুরছে।