শিক্ষক যখন শোষক: কোচিং বাণিজ্যের ‘জিম্মি দশায়’ শিক্ষার্থীরা

মূল ভাবনা: 

শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত এবং নবুয়তি দায়িত্বের অংশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার এক শ্রেণির অসাধু শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে এই মহান পেশার মর্যাদা ধুলোয় মিশছে। ক্লাসে যথাযথ পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের নিজের কাছে প্রাইভেট বা কোচিং পড়তে বাধ্য করা এবং না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক কর্মকাণ্ড এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। এই প্রবণতাকে সরাসরি ‘আমানত খেয়ানত’ ও ‘জুলুম’ হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট আলেম ও সমাজচিন্তকরা।

জিম্মি দশায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবক

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক শিক্ষক সরকারি বা প্রতিষ্ঠান থেকে পূর্ণ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও ক্লাসে তার সামান্য অংশও ব্যয় করেন না। বরং সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করেন যে—তার কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব নয়।

যারা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাইভেট পড়তে পারে না, তাদের প্রতি শ্রেণিকক্ষেই প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হয়। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থী শুধুমাত্র শিক্ষকের ব্যক্তিগত কোচিংয়ে না যাওয়ার কারণে ‘অকৃতকার্য’ বা ‘ফেল’ করার গ্লানি নিয়ে বাড়ি ফিরছে। এটি শিক্ষার নামে স্পষ্ট চাঁদাবাজি।

ইসলামের দৃষ্টিতে ‘কোচিং বাণিজ্য’ ও প্রতারণা

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, শিক্ষকতা একটি পবিত্র আমানত। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসা’র ৫৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।

যখন একজন শিক্ষক রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান থেকে পূর্ণ বেতন নিচ্ছেন কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর সময় ফাঁকি দিচ্ছেন, তখন তিনি মূলত ‘মাপে কম’ দিচ্ছেন। যার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ বলে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুতাফফিফীনে সতর্ক করা হয়েছে।

বিশিষ্ট আলেমদের মতে, কোনো শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে বা পরীক্ষায় ফেল করানোর হুমকি দিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে টাকা নেওয়া—এক প্রকার বলপ্রয়োগ করে সম্পদ লুণ্ঠনের শামিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:

“যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম)

বিবেকের কাঠগড়ায় শিক্ষক সমাজ

শিক্ষাবিদদের মতে, একজন শিক্ষকের অবহেলা বা অনৈতিকতা একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিতে পারে। প্রাইভেট বাণিজ্য বাড়াতে যারা শিক্ষার্থীদের জিম্মি করছেন, তাদের এই উপার্জন কি সত্যিই হালাল? যে হারাম উপার্জনে পরিবার পালিত হচ্ছে, তা পরকালে জান্নাত লাভের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

মজলুম ছাত্র বা তার অসহায় বাবা-মায়ের চোখের পানি আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দেয়। দুনিয়াতে হয়তো ক্ষমতার দাপটে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে পার পাওয়া সম্ভব, কিন্তু আখিরাতের আদালতে এই আমানত খেয়ানতের বিচার অনিবার্য।

এক নজরে সতর্কবার্তা: যে শিক্ষক বেতনের বিনিময়ে ক্লাস নেন কিন্তু সেখানে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেটে জোর করেন, তিনি সূরা আল-মুতাফফিফীনের সেই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত যারা মাপে কম দেয়। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন ধ্বংস।

শিক্ষকের প্রতি বিবেকের প্রশ্ন

আপনি কি চান আপনার নিজের সন্তান এমন কারো কাছে শিক্ষা গ্রহণ করুক যে অনৈতিক? যদি নিজের সন্তানের বেলায় তা না চান, তবে আপনি শিক্ষক হয়ে কেন অন্য ছাত্রের প্রতি অন্যায্য আচরণ করছেন? মনে রাখবেন, জুলুম কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং প্রকৃতির প্রতিশোধ অত্যন্ত নিষ্ঠুর।

উত্তরণের পথ: প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি

শিক্ষা ব্যবস্থাকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে হলে শিক্ষকদের সবার আগে আত্মশুদ্ধি জরুরি। একজন শিক্ষককে বুঝতে হবে, তিনি ক্লাসের প্রতিটি ছাত্রের মেধার আমানতদার।

  • সততা: শিক্ষার্থীর কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে তা অভিভাবককে সততার সাথে জানানোই একজন আদর্শ শিক্ষকের কাজ, তাকে ব্যবসার হাতিয়ার বানানো নয়।
  • নৈতিকতা: জাতির মেরুদণ্ড গড়তে হলে শিক্ষকদের পুনরায় নৈতিকতা ও সততার পথে ফিরে আসার কোনো বিকল্প নেই।
  • পেশাদারিত্ব: একজন আদর্শ শিক্ষকের কাছে প্রতিটি ছাত্র তার সন্তানের মতো। আর সন্তানের সাথে কোনো পিতা-মাতা প্রতারণা করতে পারে না।

উপসংহার:

আসুন, আমরা শিক্ষকতাকে বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে রক্ষা করি এবং আবারও একে সেই ‘নবুয়তি পেশার’ সর্বোচ্চ মর্যাদায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই। প্রশাসন, অভিভাবক ও বিবেকবান শিক্ষক সমাজের সম্মিলিত প্রচেক্ষাই পারে এই জিম্মি দশা থেকে আমাদের শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে।

আপনার পত্রিকার ফরম্যাট অনুযায়ী এই লেআউটটি সরাসরি পাতায় বা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশ করার জন্য একদম উপযুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *