শাহিন আলম হৃদয়, স্টাফ রিপোর্টার

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার ১নং চরপাকেরদহ ইউনিয়নের পাকরুল সূর্যমুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে উপবৃত্তির সরকারি তালিকা ও পেমেন্ট লিস্ট নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা অসঙ্গতি।
সম্প্রতি মাদারগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে বিদ্যালয়ে অনুসন্ধানে গেলে অনিয়মের এ তথ্য বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খলিলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উপবৃত্তির একটি পেমেন্ট লিস্ট সরবরাহ করেন।
উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত পেমেন্ট লিস্ট (জানুয়ারি ২৬ – জুন ২৬ চক্র) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তালিকায় নাম থাকা ১৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উপবৃত্তি পাচ্ছে মাত্র ১২ জন। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তালিকায় ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিপা আক্তারের নাম থাকা এবং তার নামে উপবৃত্তির টাকা উত্তোলন করার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলা শিক্ষা অফিসের পেমেন্ট লিস্টের সাথে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে থাকা তালিকার কোনো মিল নেই। সাংবাদিকরা বিদ্যালয়টির অভ্যন্তরীণ তালিকা দেখতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দুই তালিকার পার্থক্য সম্পূর্ণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পেমেন্ট লিস্টে দেওয়া মোবাইল নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করা হলে বেরিয়ে আসে আরও অসংগতি। কয়েকটি নম্বর বন্ধ পাওয়া গেলেও, একাধিক নম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান তারা দুইবার উপবৃত্তির টাকা পেয়েছেন। তবে তালিকার প্রতিটি নম্বরের মালিকানা ও লেনদেন সম্পূর্ণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি টাকা কেটে নেওয়া ও আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন:
শিক্ষার্থী আমেনার অভিযোগ: তার নামে উপবৃত্তির টাকা বরাদ্দ হলেও দুইবার পাওয়ার পর আর কোনো টাকা আসেনি। সে জানায়, টাকা তোলার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তার কাছ থেকে দুইবারে ৫০০ টাকা করে রেখে দিয়েছেন।
শিক্ষার্থী সুমাইয়ার পরিবার: তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়ার বাবা মিজানুর রহমান জানান, উপবৃত্তির তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তার মেয়ে কোনো টাকা পাচ্ছে না। পুরো টাকাই প্রধান শিক্ষক আত্মসাৎ করছেন বলে তার অভিযোগ।
স্বজনপ্রীতির অভিযোগ: স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষক নিজের বোনের মেয়ে ও বোনের ব্যবহৃত সিম নম্বর ব্যবহার করে নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা তুলছেন। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
অভিভাবকদের বড় প্রশ্ন—সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী উপবৃত্তির টাকা সরাসরি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে যাওয়ার কথা। সেখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কোন এখতিয়ারে শিক্ষার্থীদের হাতে নগদ টাকা তুলে দিলেন?
এলাকাবাসীর মতে, বর্তমান ডিজিটাল যুগেও যদি এমন কারচুপি ঘটে, তবে বিগত বছরগুলোতেও ব্যাপক অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তাই শুধু চলতি অর্থবছর নয়, গত কয়েক বছরের উপবৃত্তির তালিকা, পেমেন্ট লিস্ট এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব গভীরভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন ক্যামেরার সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। সংক্ষেপে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে আমি রাজি নই।”
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও) গোলাম কিবরিয়া বলেন, “আসলে ভুলটি কার, তা এই মুহূর্তে স্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, “আমি নিজে ওই বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করেছি। তদন্তের ওপর ভিত্তি করে অভিযুক্ত শিক্ষককে শোকজ করার প্রক্রিয়া চলছে।”
বিদ্যালয়টিতে উপবৃত্তি বিতরণে স্বচ্ছতা ফেরাতে গত কয়েক বছরের সামগ্রিক পেমেন্ট রেকর্ড ও তালিকা নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।