তীব্র তাপদাহে পুড়ছে জামালপুর: ৪ দিনে হিটস্ট্রোকে ৪ জনের মৃত্যু, জনজীবন বিপর্যস্ত

ঈদের পর থেকেই জামালপুর জেলাজুড়ে জেঁকে বসেছে তীব্র তাপদাহ। প্রখর রোদ, অসহনীয় ভ্যাপসা আবহাওয়া আর সেই সাথে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জেলার জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন শ্রমজীবী, কৃষক, শিশু ও বৃদ্ধরা। এরই মধ্যে জেলায় গত ৪ দিনে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

হিটস্ট্রোকে প্রাণহানি: স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মাঠে কাজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন মৃত ব্যক্তিরা।

  • মাদারগঞ্জ: সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে মাদারগঞ্জ উপজেলার মোসলেমাবাদ গ্রামে খড় শুকানোর সময় টুনু আকন্দ (৫৫) নামে এক কৃষক হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
  • বকশীগঞ্জ: গত মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে বকশীগঞ্জ উপজেলার মেরুরচর ইউনিয়নের রবিয়ারচর বিলে বোরো ধান কাটার সময় সানোয়ার হোসেন (৬৫) নামের এক প্রবীণ কৃষক হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
  • দেওয়ানগঞ্জ ও অন্যান্য: এর আগে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাররামরামপুর ইউনিয়নের কৃষক আসাদুল হক (৪৫) সহ আরও একজন তীব্র গরমে মাঠে কাজ করার সময় অসুস্থ হয়ে প্রাণ হারান।

জনজীবনে নাভিশ্বাস ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা: বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সূর্য যেন আগুন ছড়াচ্ছে। ফলে শহর ও গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট দুপুরের দিকে প্রায় ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা খেটে খাওয়া মানুষ।

এক রিকশাচালক জানান, “গরমে রাস্তায় টেকা যাচ্ছে না। একটু চালালেই বুক ধড়ফড় করে। মানুষজনও বাইরে কম বের হচ্ছে, তাই আয়-রোজগারও কমে গেছে।”

প্রশাসনের বক্তব্য ও সর্তকতা: মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, “চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে দুপুরের প্রখর রোদ এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে কায়িক পরিশ্রম না করার বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।”

চিকিৎসকদের পরামর্শ ও করণীয়: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানান, অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পার হয়ে গেলে এবং শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে ‘হিট স্ট্রোক’ হয়। এটি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি।

হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে চিকিৎসকদের জরুরি নির্দেশনা: ১. প্রখর রোদে দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করা থেকে বিরত থাকা। ২. বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, ক্যাপ বা টুপি ব্যবহার করা। ৩. শরীর ঠান্ডা রাখতে সুতি ও হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরা। ৪. প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি ফলের রস পান করা। ৫. চা, কফি বা অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় পরিহার করা।

আক্রান্ত হলে করণীয়: কেউ হঠাৎ গরমে অসুস্থ বা অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে নিয়ে যেতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিতে হবে এবং মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে। অবস্থার উন্নতি না হলে দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এই ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি বজায় থাকতে পারে। ফলে আগামী কয়েকদিন সাধারণ মানুষকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করার অনুরোধ জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *