মোস্তাফিজুর রহমান, ধামরাই প্রতিনিধি

ঢাকার ধামরাইয়ে ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসে ৫টি গ্রামের প্রায় ২৫ একর জমির ধান পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রায় শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষক তাদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। প্রতি বছরই ইট ভাটার আগুনের ধোঁয়ায় এমন ঘটনা ঘটে। কোটি টাকার জমির ধান পুড়ে নষ্ট হওয়ার ঘটনায় দিশেহারা ভুক্তভোগী শতাধিক কৃষক।
এমন ঘটনা ঘটেছে উপজেলার আমতা ইউনিয়নে।
রবিবার (৩ মে) বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা
তাদের জমির পাশে সমবেত হয়ে ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন।
সরেজমিনে জানা যায়, ধামরাই উপজেলার আমতা ইউনিয়নের বাউখন্ড, নান্দেস্বরি, চালা, নারায়নপুর, ভাবনহাটি গ্রামের শতাধিক কৃষকের প্রায় ২৫ একর জমির ধান পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ জমির পাশেই রয়েছে আলিফ ব্রিকস, আল মদীনা ব্রিকস, টাইগার ব্রিকস নামে বেশ কয়েকটি ইটভাটা। কয়েক দিন আগে এসব ইট ভাটা চলতি মৌসুমের আগুন বন্ধ করা হলে ভাটার বিষাক্ত গ্যাসে এই ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের শতাধিক কৃষকের প্রায় ২৫ একর জমির ধান পুড়ে যায়। কৃষকরা জমির পাশে গিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। প্রশাসনের কাছে হস্তক্ষেপ কামনা করছে তাদের ক্ষতি পূরণের জন্য। এভাবে প্রতি বছর যদি কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল ইট ভাটার আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে খাদ্য সংকটও দেখা দিতে পারে।
একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বলেন, আলিফ ব্রিকস, আল-মদীনা ও টাইগার ব্রিকস নামে ইটভাটা গুলোর বিষাক্ত গ্যাসে আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। আমতা ইউনিয়নের ৫ গ্রামের কৃষকের প্রায় ২৫ একর জমির ধান পুড়ে নষ্ট গেছে। এখন যে থোড় ধান বা দুধ ধান বের হচ্ছে তা চিটা হয়ে যাবে। আমাদের এতো কষ্টের ফসল প্রতি বছর ইট ভাটার আগুনের কারণে নষ্ট হচ্ছে।
ভাবনহাটি গ্রামের কৃষক আমজাদ আলী, সাত্তার, জিন্নত আলীরা বলেন, আমরা জমির মালিকের কাছে থেকে জমি পত্তন নিয়ে চাষাবাদ করছি। সারা বছরের জন্য ফসল ঘরে তুলবো। কিন্তু এখন কি করবো। জমির পত্তন বাবদ জমির মালিককে বিঘা প্রতি বছরে ২৫ হাজার টাকা দিতে হয়। এরপর চাষাবাদের খরচ। অনেক টাকা বাকি পরে আছে সারের দোকানে। অপরদিকে এই ধান দিয়ে সারা বছরের খাবার জোটে। এখন কি করব, কোন গতি নেই।
কৃষক নন্দলাল বলেন, এমনিতেই উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দূর্যোগে ফসল নষ্ট হয়। এর উপর মানবসৃষ্ট ঘটনায় আমাদের জমির ধান নষ্ট হচ্ছে। আমরা কি করতে পারি। ভাটার মালিকরা প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে কথাও বলতে পারি না। আমাদের কষ্টার্জিত ঘামে উৎপাদন করা জমির ফসল এভাবে প্রতি বছর নষ্ট হয়। এর একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
জমির মালিক নকি ও ইনাম বলেন,প্রতি বছরই ইট ভাটার কারণে এমন ঘটনা ঘটে। এ সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান চাই। প্রতি বছরই এই ভাটা গুলোর জন্য সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের। শুধু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলে হবে না, ফসলি জমির সাথে গড়ে তুলা এ ধরনের ইটভাটা বন্ধ করতে হবে। তা না হলে সব সময়ই এমন ঘটনা ঘটবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া জমির পাশে গিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে থাকে। বিক্ষোভ সমাবেশের খবর পেয়ে ধামরাই উপজেলা কৃষি অফিসার আরিফ হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, আমতা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের কৃষকের এই ফসলি জমির মাঠগুলো আমরা দেখেছি। প্রায় ২৫ একরের জমির ধানই ফুল অবস্থায় রয়েছে এবং এই ফুল ধান পরবর্তী দুধ অবস্থায় আসে। এই ধানের ফুলের উপর দিয়ে ইট ভাটার গরম বাতাস যাওয়ার কারণে পাতা পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। যে ধান ফুল অবস্থায় রয়েছে সেগুলো পরাগায়নে সমস্যায় চিটা হয়ে যাবে। কৃষকের ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। খুব দ্রুত সময়ে ভাটা মালিকদের সাথে কথা বলে এর একটা ব্যবস্থা করব। যেন কৃষকরা সন্তুষ্ট হয়। কারণ তাদের কষ্টে অর্জিত ফসল এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগামীতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সে বিষয়ে চেষ্টা করব। এখানে শতাধিক কৃষক এসেছেন। আমি সকলকে আশ্বস্ত করেছি। খুব দ্রুত এটার সমাধান হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আল মামুন বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে দোষী ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যবস্থাও করা হবে।