
আসন্ন ৩১তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (COP31) সামনে রেখে তুরস্কের আন্টালিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি সভায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ‘ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা তহবিল’ (Loss and Damage Fund) কার্যকর করা এবং এর স্থায়ী সংস্থানের দাবিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো এবার সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
প্রস্তুতি সভায় অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি উন্নত দেশগুলো তাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা স্বীকার করে দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত না করে, তবে আগামী নভেম্বরের মূল সম্মেলনটি কেবল আরেকটি ‘ব্যর্থ আলোচনার টেবিলে’ পরিণত হবে।
তহবিলের শূন্যতা ও অস্তিত্বের সংকট
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মিশরের শারম আল-শেখে তহবিল গঠনের ঘোষণা আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েক শ মিলিয়ন ডলার জমা পড়েছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত শত বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
আন্টালিয়ার বৈঠকে জি-৭৭ ও চীনের প্রতিনিধিরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমরা কেবল প্রতিশ্রুতির আশ্বাস নিয়ে ফিরে যেতে আসিনি। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে অর্থায়ন হবে স্বয়ংক্রিয় এবং স্বচ্ছ।” বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঋণের পরিবর্তে সরাসরি অনুদান হিসেবে এই অর্থ প্রদান করতে হবে।
প্রস্তুতি সভার প্রধান ৩টি দাবি:
১. বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি: ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি ক্ষতিপূরণ তহবিলে জমা দেওয়া।
২. সহজ শর্তে অর্থায়ন: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সরাসরি অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
৩. প্রযুক্তি হস্তান্তর: কেবল অর্থ নয়, বরং লবণাক্ততা সহিষ্ণু কৃষি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নত প্রযুক্তি বিনামূল্যে সরবরাহ করা।
উন্নত দেশগুলোর টালবাহানা
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা তহবিলের স্বচ্ছতা এবং চীন বা উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর অবদান রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বৈঠকে এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের অভিমত
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আশরাফ হোসেন বলেন, “২০২৬ সাল হলো জলবায়ু কূটনীতির জন্য এক সন্ধিক্ষণ। তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া COP31 যদি অর্থায়নের একটি শক্ত কাঠামো দাঁড় করাতে না পারে, তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলগুলোর জন্য সময় ফুরিয়ে আসবে।”
আসন্ন নভেম্বরে তুরস্কের আন্টালিয়ায় মূল সম্মেলনে বিশ্বনেতারা এই সংকটের সমাধানে কোনো ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।