​যুদ্ধ শেষের দ্বারপ্রান্তে ইরান-যুক্তরাস্ট্র : যেকোনো মুহূর্তে আসতে পারে বড় ঘোষণা

​দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ ও চরম উত্তেজনা শেষে অবশেষে শান্তি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং অবরুদ্ধ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’ (Largely Negotiated) হয়েছে।
​আজ রবিবারের মধ্যে যেকোনো মুহূর্তে বিশ্ববাসী এ বিষয়ে একটি বড় ধরনের “সুসংবাদ” পেতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন ভারতে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
​ট্রাম্পের বড় ঘোষণা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
​শনিবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে দফায় দফায় ফোনালাপের পর এই চুক্তির খসড়া তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি মূলত সম্পন্ন হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।”
​নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “গত ৪৮ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। হয়তো আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ব একটি ভালো খবর পেতে যাচ্ছে।”
​মধ্যস্থতায় পাকিস্তান: আবারও মুখোমুখি আলোচনার প্রস্তুতি
​ঐতিহাসিক এই শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। গত এপ্রিলে ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে প্রথম মুখোমুখি বৈঠকের পর, গত শুক্রবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনির তেহরানে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।
​পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ট্রাম্পের এই শান্তি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, “খুব শীঘ্রই পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনা আয়োজন করতে যাচ্ছে।”
​চুক্তির মূল শর্তসমূহ ও মতপার্থক্য (ইনফোগ্রাফিক্স/বক্স ডাটা)
​ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘তাসনিম নিউজ’-এর বরাতে চুক্তির সম্ভাব্য খসড়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে:
​যুদ্ধবিরতি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল: সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হবে এবং আলোচনা চলাকালীন ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হবে।
​হরমুজ প্রণালী: আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্বস্তির জন্য হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে ৩০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ ‘ফার্স নিউজ’ দাবি করেছে, প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও পারমিট দেওয়ার একক ক্ষমতা ইরানের হাতেই থাকবে।
​পরমাণু কর্মসূচি: চুক্তির প্রাথমিক খসড়ায় ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো পরিবর্তন আনতে রাজি হয়নি। তবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য একটি উইন্ডো রাখা হয়েছে।
​তেহরানের হুঁশিয়ারি
​চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা থাকলেও নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনির অনুমতি সাপেক্ষে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি ট্রাম্প আবারও কোনো মূর্খতা করেন এবং যুদ্ধ শুরু হয়, তবে এবারের প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রথম দিনের চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও তিক্ত হবে।”
​বিশ্ব বাজারের প্রতিক্রিয়া
​এই শান্তি আলোচনার খবরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। মাসের পর মাস হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি যে সংকটে পড়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে তার অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন বিশ্লেষকরা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
​সব মিলিয়ে, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারকে দুই দেশ স্বাক্ষর করলে মধ্যপ্রাচ্যে গত তিন মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *