শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তুরস্কের সাথে উত্তেজনা: আজারবাইজানে হিজাব বিতর্কের নেপথ্যের ঘটনা

রিপোর্টার লাভলু

১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আন্তর্জাতিক সংবাদ

আজারবাইজানে সরকারি স্কুলের পোশাকবিধি ঘিরে হিজাব বিতর্ক এখন শিক্ষা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিরোধে রূপ নিয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর হিজাব পরা ছাত্রীদের স্কুলে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সমস্যায় পড়েছেন নারী শিক্ষকেরাও। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে ৩৭ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত নতুন স্কুল পোশাকবিধি থেকে। নিয়মে সরাসরি ‘হিজাব নিষিদ্ধ’ বলা হয়নি; বরং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে অসংগত পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কিছু স্কুলে হিজাব পরা ছাত্রী ও শিক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর প্রতিবাদ শুরু হয়।

১. কেন হিজাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক?

আজারবাইজানের সরকার গত সেপ্টেম্বর মাসে স্কুলের পোশাকবিধিতে পরিবর্তন আনে। সরকারের যুক্তি, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবার জন্য অভিন্ন পোশাকবিধি এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।

কিন্তু নতুন নিয়ম কার্যকর করতে গিয়ে কয়েকটি স্কুলে হিজাব পরা ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। হিজাব পরা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ফলে নিয়মটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

২. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইংরেজির শিক্ষিকা গুলশান আলিয়েভার ঘটনা। ২৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকা আলিয়েভা হিজাব পরে স্কুলে গেলে তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তাঁর মেয়েকেও বাকুর একটি উচ্চবিদ্যালয়ে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।

আলিয়েভার বক্তব্য, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে যেন তাঁর চাকরি ও মেয়ের শিক্ষা বাধাগ্রস্ত না হয়। তিনি দেশটির শ্রম আইনের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন।

এদিকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে নতুন নিয়মের বিরোধিতা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করার কথা জানায় আজারবাইজানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

৩. মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর জোর কেন?

আজারবাইজানের জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম। তবে দেশটির সংবিধান রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

এখানে সাংবিধানিকভাবে দুটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ:

  • ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও শিক্ষা: সংবিধানের ৭ ও ১৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথক অবস্থান নির্ধারণ করে।
  • বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা: ৪৮ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের বিবেক ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, স্কুলে অভিন্ন পোশাকবিধি বজায় রাখার নামে ধর্মীয় পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা কতটা যৌক্তিক এবং তা সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

৪. তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা কেন বাড়ল?

তুরস্ক ও আজারবাইজানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। দুই দেশের সম্পর্ক বোঝাতে প্রায়ই ‘এক জাতি, দুই রাষ্ট্র’ কথাটি ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু হিজাব বিতর্কে দুই দেশের অবস্থান আলাদা হয়ে গেছে।

তুরস্কের অবস্থান

তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের উপদেষ্টা ওকতাই সারাল স্কুলে হিজাব পরা ছাত্রীদের প্রবেশে বাধা দেওয়াকে অগ্রহণযোগ্য বলে সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।

আজারবাইজানের অবস্থান

ক্ষমতাসীন নিউ আজারবাইজান পার্টি তুর্কি কর্মকর্তাদের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করেছে। দলটির যুক্তি, স্কুলের পোশাকবিধি দেশটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং তা ধর্মনিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।

এই বিরোধ দেখিয়ে দিয়েছে, ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ধর্ম, রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে দুই দেশের নীতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।

৫. বিতর্কের পেছনে কি আরও বড় রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে?

আজারবাইজানে ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল শিক্ষাব্যবস্থার নীতি নয়; এটি দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিচয়েরও অংশ। সরকার ধর্মীয় পোশাকের প্রশ্নকে অভিন্ন নিয়ম ও জাতীয় পরিচয়ের আলোকে দেখছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, হিজাবের কারণে শিক্ষার্থীকে স্কুলের বাইরে রাখা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

আজারবাইজানের বিরোধী দল REAL পার্টির নেতা নাতিগ জাফারলি ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সমঝোতামূলক ব্যবস্থা বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে দেশটির মুসলিম বোর্ডের প্রধান শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদে হিজাবকে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যদিও তিনি স্কুলে বিশৃঙ্খলারও সমালোচনা করেছেন।

সামনে কী হতে পারে?

এই বিরোধের পরিণতি তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে:

  • সরকার স্কুলের পোশাকবিধির প্রয়োগে ছাড় দেয় কি না।
  • বাধাপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আদালতে গিয়ে প্রতিকার পান কি না।
  • তুরস্ক ও আজারবাইজান নিজেদের অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে মতবিরোধ সামাল দিতে পারে কি না।

এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে বলা যায়, বিতর্কটি কেবল হিজাব পরার অনুমতি নিয়ে নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় এবং শিক্ষার অধিকার—এই তিনটির মধ্যে সীমারেখা কোথায় টানা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *