গ্রামীণ সড়কে ফসল শুকানোর হিড়িক : সংকটের টেকসই সমাধান কী?

চলতি বোরো মৌসুমে জামালপুরের মেলান্দহসহ দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদে আবার ফিরে এসেছে একটি চেনা অথচ উদ্বেগজনক দৃশ্য। মাঠ থেকে সোনালী ফসল ঘরে তোলার আনন্দের সমান্তরালে গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলো এখন পরিণত হয়েছে উন্মুক্ত চাতালে। মাইলের পর মাইল পাকা ও কাঁচা সড়ক জুড়ে ধান মাড়াই এবং খড় শুকানোর এই হিড়িক কেবল যাতায়াত ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সড়ক নিরাপত্তাকে এক বড়সড় ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

ভোগান্তি ও প্রয়োজনের এই দ্বন্দ্বটিকে কেবল ‘আইন অমান্যের’ সরল সমীকরণ দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত সমাধান মিলবে না। এর পেছনে রয়েছে গ্রামীণ অবকাঠামোর রূপান্তর এবং কৃষকের গভীর চাতাল সংকট।

ভোগের সড়ক, ভয়ের পথ: সরেজমিন বাস্তবতা

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও সংযোগ সড়ক ঘুরে যে চিত্রটি প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে, তা রীতিমতো বিপজ্জনক। সড়কের সিংহভাগ জুড়ে বিছিয়ে রাখা হয়েছে ভেজা ধান ও পিচ্ছিল খড়। কোথাও কোথাও মোড়ের ঠিক মাথায় খড়ের বড় বড় স্তূপ করে রাখায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন চালকদের দৃষ্টিসীমা (Blind spot) সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে সড়ক নিরাপত্তায়। শুকনো বা আধা-শুকনো খড়ের ওপর দিয়ে যখন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, মোটরসাইকেল বা হালকা ট্রাক চলাচল করে, তখন ব্রেক ধরলেই চাকা নিয়ন্ত্রণ হারায়। সকালের শিশির বা আকস্মিক হালকা বৃষ্টি এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। এছাড়া, চলন্ত যানের চাকায় খড় পেঁচিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা ঘর্ষণে অগ্নিকাণ্ডের যে আশঙ্কা সচেতন মহল করছেন, তা মোটেও অমূলক নয়। চালকদের ক্ষোভ এবং কৃষকদের ‘নিরুপায়’ যুক্তির মধ্যকার নিত্যদিনের বাগ্বিতণ্ডা গ্রামীণ সামাজিক শান্তিকেও বিঘ্নিত করছে।

সংকটের মূলে ‘খলা’ ও পারিবারিক উঠানের বিলুপ্তি

কৃষকদের সাথে গভীরভাবে আলাপ করলে একটি কাঠামোগত সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। গ্রামীণ জনপদে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিয়েছে। ফলে বসতবাড়ির পরিধি বেড়েছে এবং অতীতে ধান শুকানোর জন্য ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী বড় উঠান বা যৌথ ‘খলা’ (উন্মুক্ত চাতাল) প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসমীয়া বৃষ্টি ও মাঠের কাদার কারণে কৃষকের সামনে দ্রুত ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। তাদের ভাষ্যমতে, “রাস্তায় রোদ পাওয়া যায় দ্রুত, আর ঘরের কাছে কোনো খোলা জায়গা নেই।” অর্থাৎ, কৃষকেরা স্বেচ্ছায় সড়ক দখল করছেন না, বরং কাঠামোগত অভাব তাদের বাধ্য করছে।

আইনি নিষেধাজ্ঞা বনাম বাস্তবতার সংঘাত

সরকারি নিয়মানুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) আওতাধীন কিংবা যেকোনো পাবলিক সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু গ্রামীণ বাস্তবতায় কেবল পুলিশি বা প্রশাসনিক লাঠিপেটা কিংবা জরিমানা করে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ফসল শুকানো না গেলে তা পচে নষ্ট হবে, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত হানবে। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য।

নির্বাহী সুপারিশ: টেকসই সমাধানের পথ

এই সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং জনপ্রতিনিধিদের একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে:

কমন ড্রায়িং ইয়ার্ড (যৌথ চাতাল) স্থাপন: প্রতিটি ইউনিয়ন বা বড় কৃষিপ্রধান গ্রামে সরকারি খাস জমি চিহ্নিত করে কিংবা স্থানীয় বাজারের পাশে স্থায়ী ‘কমন ড্রায়িং ইয়ার্ড’ বা কংক্রিটের চাতাল নির্মাণ করতে হবে। যেখানে কৃষকেরা নামমাত্র মূল্যে বা শিফটিং পদ্ধতিতে ধান শুকাতে পারবেন।

মৌসুমী খলা লিজিং: বোরো বা আমন মৌসুমের নির্দিষ্ট ১৫-২০ দিনের জন্য স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ বা ঈদগাহ ময়দানগুলোকে (শর্তসাপেক্ষে ও তদারকির মাধ্যমে) ধান শুকানোর সাময়িক চাতাল হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

ইউনিয়ন পরিষদের কঠোর তদারকি: যতক্ষণ বিকল্প ব্যবস্থা না হচ্ছে, ততক্ষণ অন্তত সড়কের বাঁকগুলোতে এবং প্রধান প্রধান ব্যস্ত সংযোগ সড়কে ধান-খড় ছিটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এটি বাস্তবায়নে গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় ইউপি সদস্যদের দায়িত্ব দিতে হবে।

শেষ কথা

কৃষি আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, আর সড়ক আমাদের যোগাযোগের ধমনী। একটিকে সচল রাখতে গিয়ে অন্যটিকে ঝুঁকিতে ফেলার আত্মঘাতী সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কৃষকের ফসল শুকানোর অধিকার যেমন সত্য, সাধারণ নাগরিকের নিরাপদে সড়কে চলাচলের অধিকারও সমভাবে সত্য। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ গ্রহণ করলেই কেবল গ্রামীণ জনপদের এই চিরায়ত ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার অবসান ঘটবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *