৩০ লাখের দিঘি ৬ লাখে ইজারা: মাধবপুরে ‘পুকুরচুরি’ অভিযোগে তোলপাড়

আজিজুর রহমান জয়,মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ধর্মঘর দিঘি’ ইজারা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১০ একর আয়তনের এই দিঘিটি ৩ বছরের জন্য মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে এলাকাজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, এত বড় একটি দিঘির প্রকৃত বাজারমূল্য কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকার বেশি। তারা জানান, গত বছর একই মেয়াদের জন্য সরকারি মূল্য নির্ধারণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ টাকা। অতীতেও এই দিঘি আরও বেশি দামে ইজারা হয়েছে। চলতি বছরেও ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায় ইজারা নিতে আগ্রহী ছিলেন একাধিক ব্যক্তি। পাশের আহমেদপুর দিঘি, যা আকারে ছোট, সেটিও প্রায় ৩০ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ‘ধর্মঘর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি’ নামের একটি বিতর্কিত সংগঠনের কাছে এই ইজারা দেওয়া হয়েছে, যার গত তিন বছরের কোনো বৈধ অডিট প্রতিবেদন নেই। পাশাপাশি, সমিতিতে প্রকৃত মৎস্যজীবীর উপস্থিতিও নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে “টেন্ডার ইঞ্জিনিয়ারিং” এর মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি নিলামের কথা থাকলেও ওইদিন সংশ্লিষ্ট সমিতির সভাপতি তাজুল ইসলাম বা তাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগ আছে, প্রকাশ্য নিলাম ছাড়াই ফোনের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কোথাও নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় যুবদল নেতা আমিনুর রহমান আমিনসহ একাধিক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন। প্রয়োজনে মানববন্ধনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
ইজারাপ্রাপ্ত সমিতির সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা ফোনে ইজারা পাওয়ার খবর পাই। বর্তমানে আমরা বৈধভাবে দায়িত্ব পালন করছি। সরকারি মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি প্রশাসনের। আমাদেরও প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।”
স্থানীয় মৎস্যজীবী নারায়ণ নয়ন বলেন, “আমরা ২৫ লাখ টাকা দিয়েও ইজারা নিতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু গোপনে নিলাম হওয়ায় অংশ নিতে পারিনি। প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেব।”
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সমিতির অডিট রিপোর্ট সম্পর্কেও তিনি নীরব থাকেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেম বলেন, “নিয়ম মেনেই নিলাম সম্পন্ন হয়েছে। কেউ বেশি মূল্য দিতে চাইলে অংশগ্রহণ করা উচিত ছিল।” তবে নিলাম বিজ্ঞপ্তি বা অডিট সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট জবাব দেননি।
এদিকে, এ অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে দুইজন স্থানীয় ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
হবিগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ এরশাদ আলী জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় অনেক কম দামে ইজারা দেওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে। তারা দ্রুত তদন্ত, ইজারা বাতিল এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় নিলামের দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *