দেওয়ানগঞ্জে নদীভাঙনে নিঃস্ব বহু পরিবার, শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা

ফারুক মিয়া, দেওয়ানগঞ্জ প্রতিনিধি

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বহু পরিবার। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ভাঙনকবলিত চরাঞ্চলে শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার সংকটে অনেক শিশু নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও ঘটছে বাল্যবিবাহের ঘটনাও। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের শিকার এসব মানুষের দুর্ভোগ বাড়লেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

দেওয়ানগঞ্জ নদনদীবিধৌত একটি উপজেলা। এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, জিঞ্জিরাম ও দশানী নদী। একসময় কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের গোলাভরা ধান ও গোয়ালভরা গরু ছিল। কিন্তু সত্তরের দশক থেকে নদীভাঙনের কারণে বদলে যেতে থাকে মানুষের জীবনযাত্রা। ক্রমাগত ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে আবাদি জমি, বসতভিটা ও জনবসতি।
ডাংধরা ও চরআমখাওয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা ও জিঞ্জিরাম নদী। নদীভাঙনে এসব ইউনিয়নের খোলাবাড়ি, চিথুলিয়া, মোল্লারচর, এরান্ডাবাড়ি, জিগাবাড়ি, মৌলভীরচর, চুনালীপাড়া, মুন্সিপাড়া, মণ্ডলপাড়া, সানন্দবাড়ী পশ্চিমপাড়া ও পাটাধোয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার জনবসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো কোনো গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একসময় যেখানে ছিল মানুষের বসতি, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ বালুচর।

স্থানীয় বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, ডাংধরা ও চরআমখাওয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনকবলিত মানুষ যে যেভাবে পেরেছেন আশ্রয় নিয়েছেন। একসময় এসব পরিবারের সুখ-শান্তি ছিল। এখন অনেকেই সব হারিয়ে জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন।

চুনালীপাড়া গ্রামের দিলবর হোসেনের বসতভিটা চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। তাঁর পাঁচ বিঘা কৃষিজমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে তিনি নিঃস্ব। তাঁর মতো আরও কয়েক শ পরিবারের একই অবস্থা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধ করা না গেলে সানন্দবাড়ী এলাকার অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
হাতীভাঙ্গা ও বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাও ব্রহ্মপুত্র ও জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চরহাতীভাঙ্গা, পোল্যাকান্দি, ফারাজীপাড়া, গুমেরচর, নয়াগ্রাম, মদনেরচর ও মাদারের চরসহ বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নতুন চর জেগে উঠলেও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেনি।

বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের চরপোল্যাকান্দি গ্রামের আমিনুল ইসলামের বসতবাড়ি তিনবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। হারিয়েছেন কৃষিজমিও। তিনি জানান, ব্রহ্মপুত্রের জেগে ওঠা চরে বসতি গড়েছেন তাঁরা। কিন্তু সেখানে বসবাস করলেও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে মুক্তি মেলেনি।

চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগব্যবস্থা নেই। ফলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবিকার সংকটের পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের।
দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়নের পূর্বাংশের মাইছানিরচর, তিলকপুর ও কাউনেরচর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর নদীভাঙনে এসব এলাকার মানুষ বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাচ্ছেন। নিঃস্ব পরিবারগুলোকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

তিলকপুর গ্রামের বাসিন্দা ফজলু মিয়া একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি বলেন, জীবনের শুরু থেকেই ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন ও মানুষের দুর্ভোগ দেখে আসছেন। কয়েক যুগ ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নদীভাঙনের কবল থেকে মুক্তি চান তাঁরা।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, যমুনা, জিঞ্জিরাম ও ব্রহ্মপুত্র নদে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন রোধে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত একটি প্রকল্প করেছেন। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেলে নদীভাঙন রোধে কার্যক্রম শুরু হবে।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, শুধু অস্থায়ী উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা। পাশাপাশি ভিটেমাটি হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, চরাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে মানুষের জীবিকা, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ এবং বহু বছরের বসতভিটা ঘিরে গড়ে ওঠা জনপদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *