ইত্তিজা মনির,বরগুনা প্রতিনিধি

সরকারি নীতিমালা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বরগুনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অবাধে চলছে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্য—এমন অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ কার্যক্রমের সম্পৃক্ত থাকায় বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।এবং শিক্ষার্থীরা ক্রমেই কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায় শাহজাহান মাস্টার ও মাইনুল মাস্টারের পরিচালনায় আমতলী খাদ্য গুদামের সামনে সাইনবোর্ড বিহীন একটি কোর্চিং সেন্টারে সকাল ১০:০০ টায় শতাধিক ছাত্র ছাত্রী বসে পড়ছে পাশ্বেই চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছেন শাহজাহান মাস্টার। একটু আগে স্কুলের উদ্দেশ্যে চলে গেছে সেন্টারের মালিক মাইনুল মাস্টার। স্থানীয়রা বলছেন মাইনুল মাস্টার প্রায়ই স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোর্চিং সেন্টার নিয়ে ব্যাস্ত থাকছেন। আমতলীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আবাসিক ভবন, ভাড়া করা কক্ষ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যাচভিত্তিক কোচিং পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কোচিং সেন্টারের অনেকগুলোরই প্রয়োজনীয় নিবন্ধন বা অনুমোদন নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে স্কুল টাইমে যখন ছাত্র ছাত্রীদের ক্লাশে থাকার কথা তখন কিসের স্বার্থে স্কুলে না গিয়ে পড়াচ্ছেন শিক্ষকরা।অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, জেলার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে মাত্র দুই থেকে তিনজন শিক্ষার্থী রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পাঠদান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠাতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, কিছু শিক্ষক ভালো ফলাফল বা বেশি নম্বর পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিজস্ব বা নির্দিষ্ট কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের পাঠাতে উৎসাহিত করেন।
জেলার বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসিক এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে। একাধিক বিষয়ে কোচিং করলে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানান একাধিক অভিভাবক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরগুনা সদরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকা ছোট। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কোচিং বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। এতে বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোচিংমুখী হয়ে পড়ছে এবং শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি জেলার আরও অনেক এলাকায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে আমতলী উপজেলায়ও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, আমতলী খাদ্য গুদামের সামনে পরিচালক মোহাম্মদ মাইনুল মাস্টারের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন সরকারে নিষেধ থাকলেও আমতলীতে শাহীন কোর্চিং নামের সেন্টারটি আপনারা ধরেন আমি একাই এই ব্যবসা করছিনা।
যিনি দক্ষিণ-পূর্ব চিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি বলেন সকলে বন্ধ করলে আমিও করব। মাইনুল মাস্টার সাংবাদিকদের মামলার ভয় দেখিয়ে বলেন আমার এরিয়ার মধ্যে এরপর যে সাংবাদিক ডুকবে তাকেই মামলায় জড়িয়ে দেয়া হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোচিং করানো হয়। তাদের আরও দাবি, প্রতিষ্ঠানটির বৈধ নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়নি এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়েও কোচিং কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে আমতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিউল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মোঃছালেহ বলেন কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ঘাটতি থাকলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিংমুখী হয়, যা তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সচেতন মহলের দাবি, সরকারি শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নিবন্ধনবিহীন কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, সরকারি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং প্রমাণ মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।