ফারুক মিয়া, দেওয়ানগঞ্জ প্রতিনিধি

বাংলার লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে জারি-সারিগানের রয়েছে বিশেষ স্থান। গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বাস্তবতা ও নানা ঘটনার কথা সুরের মাধ্যমে তুলে ধরতেন বয়াতিরা। তাঁদেরই একজন ছিলেন জামালপুরের মেলান্দহ অঞ্চলের পরিচিত লোকসংগীতশিল্পী চাঁন মিয়া বয়াতি। জীবদ্দশায় নিজের কণ্ঠ ও গানের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পাওয়া এই শিল্পী মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেলেও তাঁর গান ও স্মৃতি এখনো লোকসংগীতপ্রেমীদের কাছে মূল্যবান।প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁন মিয়া বয়াতির জন্ম ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার চরপলিশা এলাকায়। তাঁর বাবা আজিমুদ্দিন মন্ডল এবং মা শিখা বেগম। বাবা আদর করে তাঁর নাম রেখেছিলেন চাঁন মিয়া। পরবর্তী সময়ে সংগীতচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি চাঁন মিয়া বয়াতি বা চাঁন বয়াতি নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি টানশৈশব থেকেই গানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। গান শোনা, সুরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং নিজের কণ্ঠে গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর শিল্পীসত্তা। একসময় জারি-সারিগানের জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসংগীতের আসরে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী জারি ও সারিগান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এসব গানের মধ্য দিয়ে মানুষের আবেগ, সামাজিক অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও জীবনযাপনের নানা দিক প্রকাশ পায়। চাঁন মিয়া বয়াতিও তাঁর গানের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর শিল্পীজীবন ছিল বাংলার গ্রামীণ লোকসংগীতের সেই ঐতিহ্যের অংশ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে রয়েছে।যে গান তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়চাঁন মিয়া বয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ম্যাজিস্ট্রেট শামসুল হক আমায় জামিন দিল না’ শিরোনামের একটি গান। তাঁর জীবন ও সংগীত নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক লেখায় গানটির উল্লেখ পাওয়া যায়। গানটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অনেক শ্রোতার কাছে তাঁকে পরিচিত করে তুলেছিল বলে স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।লোকসংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এতে মানুষের জীবনের ঘটনা, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি সহজ ভাষায় সুরের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কখনো সামাজিক বাস্তবতা, আবার কখনো সমকালীন কোনো ঘটনা হয়ে ওঠে গানের বিষয়বস্তু। এ কারণে লোকগান একটি অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়।চাঁন মিয়া বয়াতির সঙ্গে যুক্ত গানটিও লোকসংগীতের সেই ধারার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে তাঁর গানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, পরিবেশনার ইতিহাস ও সংগীতজীবনের বিভিন্ন দিক যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এই শিল্পী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।শিল্পীদের মূল্যায়ন শুধু স্মরণে নয়, সংরক্ষণেওএকজন লোকশিল্পীর জীবন সব সময় সহজ হয় না। প্রতিভা ও জনপ্রিয়তা থাকলেও অনেক শিল্পী জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা কিংবা যথাযথ মূল্যায়নের অভাবের মুখোমুখি হন। গ্রামবাংলার অনেক গুণী শিল্পীর জীবনের নানা দিক সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের অবদান সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো তাঁদের নাম ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কেও জানতে পারবে না।চাঁন মিয়া বয়াতির জীবন ও সংগীতের স্মৃতি সংরক্ষণেও প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। তাঁর পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগীতপ্রেমীদের কাছ থেকে স্মৃতিচারণ, গান এবং জীবনের নানা তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। পাশাপাশি তাঁর গানের কোনো অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং থাকলে সেগুলো সংরক্ষণ ও ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্যোগী হলে মেলান্দহ অঞ্চলের এই শিল্পীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা সম্ভব।২০১৬ সালে প্রয়াত হন চাঁন বয়াতিপ্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁন মিয়া বয়াতি ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট নিজ জন্মভূমির কাছাকাছি ভাবকী বাজারসংলগ্ন নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লোকসংগীতের জগৎ হারায় একজন পরিচিত শিল্পীকে।মানুষের জীবন একসময় থেমে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকতে পারেন দীর্ঘদিন। বিশেষ করে লোকশিল্পীদের ক্ষেত্রে তাঁদের গাওয়া গান, পরিবেশনার স্মৃতি এবং মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া সুরই হয়ে ওঠে তাঁদের পরিচয়ের অন্যতম বাহন।চাঁন মিয়া বয়াতির জীবন ও সংগীতের ইতিহাস যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা গেলে তা শুধু একজন শিল্পীর স্মৃতি সংরক্ষণ করবে না, বরং জামালপুরের লোকসংগীতের ঐতিহ্য সম্পর্কেও নতুন প্রজন্মকে জানতে সাহায্য করবে।চাঁন মিয়া বয়াতি ছিলেন গ্রামবাংলার লোকসংগীতের ধারার একজন পরিচিত শিল্পী। তাঁর জীবন ও গানকে ঘিরে থাকা স্মৃতি সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পীদের জীবন, কর্ম ও অবদান তুলে ধরার মধ্য দিয়েই সমৃদ্ধ বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।