রিপোর্টার লাভলু

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আন্তর্জাতিক সংবাদ
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অনেক ব্যাংক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সরাসরি লেনদেন করতে পারে না। বিশেষ করে মার্কিন ডলারে লেনদেন, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার এবং তেল রপ্তানি থেকে আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে নানা বাধা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক নেটওয়ার্কগুলো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে।
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: সব বিদেশে অর্থ স্থানান্তরই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টা নয়। কিছু লেনদেন বৈধ মানবিক বাণিজ্য, ব্যক্তিগত অর্থপ্রেরণ বা অনুমোদিত বাণিজ্যের আওতায় হতে পারে; অন্যদিকে কিছু নেটওয়ার্ক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন, অর্থের প্রকৃত মালিকানা গোপন বা অর্থের উৎস আড়াল করার কাজে জড়িত।
অর্থ স্থানান্তরের প্রধান ৫টি পদ্ধতি
১. তৃতীয় দেশের মানি এক্সচেঞ্জ ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারী
ইরানের বাইরে, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ে থাকা কিছু মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারী বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন পরিচালনা করে। নির্দিষ্ট কিছু নেটওয়ার্ক বিদেশি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ইরানি গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অর্থ পরিশোধ করে।
২. বিদেশি কোম্পানি ও শেল কোম্পানি
কিছু নেটওয়ার্ক বিদেশে নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারী বা শেল কোম্পানির মাধ্যমে বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালনা করে। প্রকৃত ইরানি পক্ষের পরিচয় আড়াল করতে ভুয়া চালান, অসত্য বাণিজ্যিক বিবরণ বা জটিল কোম্পানি কাঠামো ব্যবহার করা হতে পারে।
৩. হাওয়ালা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর
হাওয়ালা-ধাঁচের ব্যবস্থায় এক দেশে অর্থ গ্রহণকারী মধ্যস্থতাকারী অন্য দেশে তার সহযোগীকে অর্থপ্রদানের নির্দেশ দেন। সাধারণত প্রতিটি লেনদেনের জন্য সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে একই অর্থ পাঠানোর প্রয়োজন হয় না; মধ্যস্থতাকারীরা নিজেদের মধ্যে পাওনা-দেনা সমন্বয় করেন। এই ব্যবস্থা নিজে থেকেই অবৈধ নয়, তবে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহার করলে আইনি ঝুঁকি তৈরি হয়।
৪. ক্রিপ্টোকারেন্সি
বিটকয়েন ও টেথারের মতো ডিজিটাল সম্পদ কিছু ব্যক্তি ও ব্যবসার জন্য প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মূল্য স্থানান্তরের মাধ্যম। তবে ক্রিপ্টো লেনদেন সম্পূর্ণ অদৃশ্য নয়—ব্লকচেইনে লেনদেনের রেকর্ড থাকতে পারে, আর এক্সচেঞ্জ ও ওয়ালেটের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পক্ষের সঙ্গে লেনদেন করলে ক্রিপ্টো ব্যবহারের কারণেই তা বৈধ হয়ে যায় না।
৫. তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থের বিকল্প নিষ্পত্তি
ইরানের রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ বিদেশে গ্রহণ, মুদ্রা রূপান্তর এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবহৃত হয়। মার্কিন অর্থ দপ্তরের ২০২৬ সালের বিবরণ অনুযায়ী, চীনা ইউয়ানে তেল বিক্রির আয় নিষ্পত্তি এবং বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে সেই অর্থ অন্য মুদ্রায় ব্যবহারের ব্যবস্থা এসব নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোন দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে?
মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবরণে কয়েকটি আর্থিক কেন্দ্রের কথা এসেছে:
- সংযুক্ত আরব আমিরাত: মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক মধ্যস্থতাকারী ও বিদেশি ব্যাংক হিসাব।
- হংকং: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কোম্পানি এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক।
- চীন: ইরানি তেল বাণিজ্য ও ইউয়ানে অর্থ নিষ্পত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
- সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া: কিছু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
এসব দেশের সব প্রতিষ্ঠান বা লেনদেন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সঙ্গে জড়িত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এসব লেনদেন শনাক্ত করে?
মার্কিন কর্তৃপক্ষ সাধারণত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখে:
- ব্যাংক হিসাবের প্রকৃত মালিক ও উপকারভোগী কারা।
- কোম্পানিগুলোর মধ্যে মালিকানা ও আর্থিক সম্পর্ক।
- চালান, পণ্যের বিবরণ এবং লেনদেনের উদ্দেশ্যে অসংগতি আছে কি না।
- একই মধ্যস্থতাকারী বা কোম্পানির মাধ্যমে অস্বাভাবিক অর্থপ্রবাহ হচ্ছে কি না।
- ক্রিপ্টো ওয়ালেট, ব্যাংক হিসাব ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শনাক্তযোগ্য সংযোগ আছে কি না।
২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন FinCEN জানায়, তাদের বিশ্লেষণে ২০২৪ সালে মার্কিন ব্যাংকের করেসপন্ডেন্ট হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য ইরানি ছায়া-ব্যাংকিং কার্যক্রম শনাক্ত হয়েছিল। এই অঙ্কটি সম্ভাব্য কার্যক্রমের হিসাব—প্রতিটি লেনদেন যে বেআইনি প্রমাণিত হয়েছিল, তা নয়।
ইরানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ স্থানান্তরের মূল কৌশল কোনো একক প্রযুক্তি নয়; বরং মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান, বিদেশি কোম্পানি, অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রেরণ ব্যবস্থা, ক্রিপ্টো এবং বিকল্প বাণিজ্যিক নিষ্পত্তির সমন্বয়। এর কিছু ব্যবহার বৈধ হতে পারে, আবার কিছু ব্যবহার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত।